বড়হাটের জঙ্গি আস্তানায় ৩ লাশ

মৌলভীবাজারে ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ শেষ হয়েছে। আস্তানায় মিলেছে ৩ জঙ্গির লাশ। এ নিয়ে জেলার দুই জঙ্গি আস্তানায় ১০ জন নিহত হলো। গতকাল শহরের বড়হাট জঙ্গি আস্তানায় অভিযান সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। এ অভিযানে দুই পুরুষ ও এক মহিলা নিহত হয়। তাদের মধ্যে একজন সিলেটের আতিয়া মহলের বাইরে বোমা হামলার ঘটনায় জড়িত বলে জানিয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। দুপুর ১২টায় অপারেশন ম্যাক্সিমাস-এর সমাপ্তি ঘোষণা করে  দেয়া প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, মৌলভীবাজারে আর কোনো জঙ্গি আস্তানা আছে- তাদের কাছে এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে বাসা ভাড়া কাকে দেয়া হচ্ছে, সে কি করে- এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী অভিযান শেষ হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে জনমনে। স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন। অপারেশন “হিট ব্যাক” ও ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ নিয়ে টানা তিন দিন নানা কৌতূহল আর উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় উদ্বিগ্ন ছিলেন প্রবাসী অধ্যুষিত জেলার মানুষ। আর দেশবাসীর কৌতূহলী প্রতীক্ষার সঙ্গে এ জেলার প্রবাসীদেরও উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না।  জেলা পুলিশের সহায়তায় সোয়াত ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট বড়হাটের এবং নাসিরপুরের বাড়ি দুটি ঘেরাও করেছিল বুধবার ভোরে। এই দুটি বাড়ির মালিকই যুক্তরাজ্য প্রবাসী একটি পরিবার। নাসিরপুরের ওই বাড়িতে বৃহস্পতিবার অভিযান শেষে নারী-শিশুসহ সাতজনের ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া যায়। ঘেরাওয়ের মুখে পালাতে না পেরে জঙ্গিরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দেয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। নাসিরপুরে অভিযান শেষে শুক্রবার সকালে বড়হাটের আবুশাহ দাখিল মাদরাসা গলির ডুপ্লেক্স বাড়িটিতে চূড়ান্ত অভিযান ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ শুরু হয়। সিলেট- মৌলভীবাজার সড়কের আধা কিলোমিটারের মধ্যে এই বাড়িতে অভিযান শুরুর পর থেকে গুলি-বিস্ফোরণের শব্দ আসতে থাকে।  বৈরী আবহাওয়ার কারণে শুক্রবার সন্ধ্যায় অভিযানে বিরতি দেয়া হয়। শনিবার সকালে ফের অভিযান শুরুর ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি  ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আমরা জানতে পেরেছিলাম যে এখানে তিনজন অবস্থান করছে, দুইজন পুরুষ ও একজন মহিলা। আমরা ভবনে প্রবেশ করেছি। আমরা এখানে তিনটি  ডেডবডি দেখেছি। দুজন পুরুষ এবং একজন মহিলা। আমাদের তথ্য ছিল যে তিনজন রয়েছে, সেই তিনজনকেই আমরা পেয়েছি। নিহত তিনজনের নাম-পরিচয় পাওয়া না গেলেও তাদের মধ্যে একজন সিলেটে বোমা হামলার ঘটনায় ‘সরাসরি জড়িত’ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। বলেন, আমরা  টেকনোলজি ব্যবহার করে দেখেছি, এখান থেকে গিয়ে ওখানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আবার এখানে ফেরত আসতে পেরেছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম  যে, এখানে শক্তিশালী বোমাসহ  বেশকিছু এক্সপ্লোসিভ এবং এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্ট এবং এ ধরনের কাজে একজন অন্তত খুব হাই লেভেলের না হলেও আপার মিড লেভেলের জঙ্গি রয়েছে। তিনি বলেন, জীবিত ধরার ইচ্ছা ছিল, তাদের সারেন্ডার করতে বলা হয়েছিল। তারা সারেন্ডার করেনি। আপনারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন কাল অনেকবার, যখন আমরা তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, তখন তারা ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। শক্তিশালী বিস্ফোরণের পর আমরা ভবনে ধোঁয়া উড়তে দেখেছি। তখন (শুক্রবার) ধারণা ছিল যে ভবনে আগুন ধরে  গেছে। আজকে যখন আমরা নিশ্চিত হলাম যে, তারা অভিযানে নিহত হয়েছে তখন ভেতরে ঢুকলাম। সিলেটের ঘটনার অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালানোর কারণে সময় লেগেছে বলে জানান মনিরুল। তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন জায়গায় এক্সপ্লোসিভ সেট করে  রেখেছিল। প্রথম দিন এক মহিলা দুটি  গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছিল। একটি বিস্ফোরিত হয় এবং একটি ধানক্ষেতে পড়েছিল। সোয়াত সদস্যরা সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছিল। অভিযান পরিচালনাকারীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাসহ সবার নিরাপত্তার খাতিরে সতর্কতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানান মনিরুল ইসলাম। কষ্ট স্বীকারের জন্য স্থানীয়দের ধন্যবাদও জানান তিনি। এদিকে জঙ্গি আস্তানায় নিহত তিনজনের লাশ উদ্ধার করে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। আজ লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে। গতকাল বিকাল পর্যন্ত দুই আস্তানা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও ১৪৪ ধারার সীমা কমানো হয়েছে। আজ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুই আস্তানায় অভিযানের বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। 
এদিকে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড়হাটে ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’-এর সময় আস্তানায় থাকা জঙ্গি দম্পতি বাথরুমেই আত্মহনন করে। এই অপারেশনকালে আরেক জঙ্গি আত্মহনন করেছে বাথরুমের পাশেই। জঙ্গিরা আত্মঘাতী হওয়ার আগে তাদের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও নগদ অর্থ পুড়িয়ে ফেলে। শুক্রবার রাতে ওই বাসার একটি কক্ষে আগুন ও  ধোঁয়া বের হতেও দেখা গেছে। শনিবার অভিযান শেষে ওই বাসায় প্রবেশের পর এই দৃশ্য দেখা গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। একজন কর্মকর্তা জানান, আস্তানার ভেতরের একজন পুরুষ ও একজন নারীর লাশ বাথরুমের মধ্যে ছিল। বাথরুমের পাশেই ছিল আরেকজনের লাশ। তিনি বলেন, আমরা ধারণা করছি, বাথরুমের নারী-পুরুষ দুজন স্বামী-স্ত্রী। তাদের তুলনায় অন্য জঙ্গির বয়স কিছুটা কম। আমরা তাদের পরিচয় জানার চেষ্টা করছি। জঙ্গি আস্তানা হিসেবে ব্যবহার হওয়া এই বাসাটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে দু’টি শয়ন কক্ষ ও একটি বসার ঘর। একটি কক্ষে একটি খাট ও সামান্য কিছু আসবাব রয়েছে। আরেকটি কক্ষে সিঙ্গেল একটি খাট থাকলেও আগুন দেয়ার কারণে তা পুড়ে  গেছে। কক্ষের ভেতর প্লাস্টিকের  চেয়ার, ড্রেসিং টেবিল, আলনা রয়েছে। ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে পোশাকসহ বিভিন্ন জিনিস। অভিযান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা সুইসাইডাল  ভেস্টের মাধ্যমে আত্মঘাতী হওয়ায় তিন জঙ্গির কোমর ও পেটের অংশ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিস্ফোরণে তাদের শরীর ঝলসে গেছে। নিহতদের আনুমানিক বয়স হবে ৩০ থেকে ৩২ বছর। নারী জঙ্গির বয়স তার চেয়ে একটু কম এবং অন্য জঙ্গি সদস্য অপেক্ষাকৃত তরুণ। তার বয়স ২০  থেকে ২৫ বছর হতে পারে। মঙ্গলবার মধ্যরাতে বড়হাটের এই জঙ্গি আস্তানাটি  ঘেরাও করে রাখা হলেও পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াত সদস্যরা এখানে মূল অভিযান শুরু করে শুক্রবার সকালে। এ সময় জঙ্গিরা ভেতরে অন্তত ১০ থেকে ১২টি বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের কারণে ভবনের ভেতরে পলেস্তরা খসে পড়ে। মেঝেতে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টার অভিযানে সোয়াত সদস্যদের অ্যাসল্ট রাইফেলের গুলিতেও ভবনটি ক্ষত-বিক্ষত হয়। শুক্রবার বিকালে পুলিশের আর্মড পারসোনাল ক্যারিয়ার (এপিসি) দিয়ে ভবনের মূল ফটকটিও ভাঙা হয়।

Comments